অপরিচিতা-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকণিকা
'অপরিচিতা' গল্পের গল্পকথক অনুপম পিতার মৃত্যুর পর মায়ের কাছেই মানুষ হয়। তবে আসল অভিভাবক তার মামা। সংসারের সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকর্তা তিনি। এই গল্পে অনুপমের বিয়ের জন্য কন্যা দেখা হয়। কন্যা (কল্যাণী) ছিল বেশ সুন্দরী ও প্রাণচঞ্চলা। আর কন্যার পিতা শম্ভুনাথ সেন ছিলেন স্পষ্টভাষী ও সুপুরুষ। অন্যদিকে অনুপমের মামা বিয়ের পণের ব্যাপারে কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নন। এখানেই গল্পের কাহিনি জটিলতায় রূপ নেয়। বেশ ঘটা করে বিয়ের কাজ শুরু হলেও এক পর্যায়ে মামার হীন মানসিকতার কারণে সব আনন্দ-আয়োজন ম্লান হয়ে আসে, বিয়ে ভেঙে যায়। যৌতুক নিয়ে নারীর চরম অবমাননাকালে শম্ভুনাথ সেন কন্যা সম্প্রদানে অসম্মতি প্রকাশ করেন। যৌতুক নিয়ে অনুপমের কোনো দোষ না থাকলেও তাকে ব্যক্তিত্বহীনের মতো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এ কারণে সে-ই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ সে তার মনোরাজ্যের প্রেয়সীকে পায় না। এরপর যদিও পুনরায় তাদের বিয়ে হতে পারত বা ট্রেনভ্রমণে ইতিবাচক কিছু ঘটতে পারত, কিন্তু কল্যাণীর দেশচেতনায় ঋদ্ধ ব্যক্তিত্বের জাগরণ এবং বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় তা আর সম্ভব হয়নি। 'অপরিচিতা' মনস্তাপে ভেঙেপড়া এক ব্যক্তিত্বহীন যুবকের স্বীকারোক্তির গল্প ও তার অক্ষমতার অকপট কথামালা। গল্পটিতে কল্যাণী চরিত্রের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বও এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
|
নাম |
প্রকৃত নাম |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। |
|
ছদ্মনাম |
ভানুসিংহ ঠাকুর। |
|
|
জন্ম পরিচয় |
জন্ম তারিখ |
৭ই মে, ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ (২৫শে বৈশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ)। |
|
জন্মস্থান |
জোড়াসাঁকো, কলকাতা, ভারত। |
|
|
বংশ পরিচয় |
পূর্বপুরুষের নিবাস |
বর্তমান বাংলাদেশের খুলনা জেলায়। |
|
পিতার নাম |
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। |
|
|
মাতার নাম |
সারদা দেবী। |
|
|
পিতামহের নাম |
প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। |
|
|
শিক্ষাজীবন |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্যকালে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্মাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমি, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করলেও স্কুলের পাঠ শেষ করতে পারেননি। ১৭ বছর বয়সে ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যান্ড গেলেও কোর্স সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তাঁর কোনো আগ্রহ ছিল না। গৃহশিক্ষকের সহায়তায় ও পারিবারিক আবহে নিজেই পড়াশোনা করেছেন। অত্যন্ত পড়ুয়া ও মেধাবী ছিলেন বলে স্বশিক্ষিত মনীষার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছেন তিনি। |
|
|
পেশা/কর্মজীবন
|
১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পিতার আদেশে বিষয়কর্ম পরিদর্শনে নিযুক্ত হন এবং ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদারি দেখাশোনা করেন। সেই সূত্রে তিনি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। তিনি শুধু কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকারই ছিলেন না, তিনি 'ছিলেন একাধারে অনন্য চিত্রশিল্পী, দক্ষ সম্পাদক এবং অসামান্য শিক্ষা-সংগঠক ও চিন্তক। নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণে নিরুৎসাহী হলেও তিনি 'বিশ্বভারতী' নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাপ্নিক ও প্রতিষ্ঠাতা। |
|
|
সাহিত্যকর্ম |
কাব্যগ্রন্থ |
মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য, গীতাঞ্জলি, বলাকা, পূরবী, পুনশ্চ, সেঁজুতি, জন্মদিনে, শেষ লেখা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। |
|
উপন্যাস |
চোখের বালি, গোরা, ঘরে-বাইরে, চতুরঙ্গ, নৌকাডুবি, যোগাযোগ, শেষের কবিতা ইত্যাদি। |
|
|
নাটক |
অচলায়তন, ডাকঘর, রক্তকরবী, রাজা, বিসর্জন, চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি। |
|
|
গল্পগ্রন্থ |
গল্পগুচ্ছ (চার খন্ড)। এতে ৯৫টি ছোটোগল্প সংকলিত হয়েছে। এছাড়া 'সে', 'গল্পসল্প' ও 'লিপিকা' গ্রন্থে তাঁর আরও গল্প সংকলিত হয়েছে। তাঁর প্রথম গল্প 'ভিখারিনী' প্রকাশিত হয় মাত্র ষোলো বছর বয়সে। |
|
|
প্রবন্ধগ্রন্থ |
বিচিত্র প্রবন্ধ, বাংলা শব্দতত্ত্ব, শিক্ষা, কালান্তর, সভ্যতার সংকট ইত্যাদি। |
|
|
ভ্রমণকাহিনি |
জাপানযাত্রী, পথের সঞ্চয়, রাশিয়ার চিঠি, য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র ইত্যাদি। |
|
|
পুরস্কার ও সম্মাননা |
'গীতাঞ্জলি' এবং অন্যান্য কাব্যের কবিতার সমন্বয়ে স্ব-অনূদিত Song Offerings গ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট (১৯১৩), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট (১৯৩৬), অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি-লিট (১৯৪০)। |
|
|
জীবনাবসান |
৭ই আগস্ট, ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ (২২শে শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ), জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। |
|
এক নজরে পাঠের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু
'অপরিচিতা' গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত মাসিক 'সবুজপত্র' পত্রিকায়, ১৩২১ বঙ্গাব্দের (১৯১৪) কার্তিক সংখ্যায়। এটি রবীন্দ্রগল্পের সংকলন 'গল্পসপ্তক'-এ প্রথম গ্রন্থভুক্ত হয় এবং পরে 'গল্পগুচ্ছ' তৃতীয় খণ্ডে (১৯২৭) অন্তর্ভুক্ত হয়।
'অপরিচিতা' গল্পের নামকরণ গল্পের নায়ক অনুপমের একটি উক্তির ওপর নির্ভর করে করা হয়েছে। উক্তিটি হচ্ছে- “ওগো অপরিচিতা, তোমার পরিচয়ের শেষ হইল না, শেষ হইবে না; কিন্তু ভাগ্য আমার ভালো, এই তো আমি জায়গা পাইয়াছি।" অনুপমের মামার মানসিকতার ফলে অনুপম ও কল্যাণীর বিয়ে ভেঙে যায়। কনে অপরিচিতাই রয়ে যায় অনুপমের কাছে। বছর খানেক পর মাকে নিয়ে ট্রেনে তীর্থে যাওয়ার সময় একজন বাঙালি মেয়ের মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে 'এখানে জায়গা আছে' শুনে মুগ্ধ হয়। গাড়ি বদলের সময় আবার সেই কণ্ঠের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাকে নিয়ে কামরায় ওঠে অনুপম। সহজ স্বচ্ছন্দ হাসি-খুশি সুন্দর মেয়েটিকে দেখে তার মা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন। কানপুরে নেমে যাওয়ার আগে মা তাকে প্রশ্ন করে জানতে পারেন সে-ই ডাক্তার শম্ভুনাথ সেনের মেয়ে কল্যাণী, যার সঙ্গে অনুপমের বিয়ে হতে গিয়েও হয়নি। কল্যাণী ও শম্ভুনাথ সেনের কাছে অনুপম বিগত ঘটনার জন্য হাত জোড় করে ক্ষমা চাইল। শম্ভুনাথ সেনের মন নরম হলেও কল্যাণী স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, বিয়ে করবে না। অনুপম কল্যাণীকে ছাড়েনি, সে কানপুরে চলে এসেছে। কল্যাণীর সঙ্গে তার দেখা হয়, কথা হয়। এটা ওটা কাজও সে করে দেয়। কল্যাণীর বাবা তাকে ক্ষমা করেছেন। কিন্তু কল্যাণী প্রতিজ্ঞা করেছে- বিয়ে করবে না। অনুপম চার বছর ধরে কল্যাণীর বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যায়। কারণ ট্রেনের কামরা থেকে শোনা মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠ 'এখানে জায়গা আছে' আজও তার হৃদয়ে অম্লান। অপরিচিতার সেই কণ্ঠই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদিও কল্যাণী তার কাছে অপরিচিতাই রয়ে গেছে। কাজেই বিষয়বস্তুর আলোকে অন্তর্নিহিত ইঙ্গিতপূর্ণ 'অপরিচিতা' নামটিই গল্পের নামকরণ হিসেবে যথার্থ হয়েছে।
*কল্যাণী: 'অপরিচিতা' গল্পের প্রধান চরিত্র কল্যাণী। সে তৎকালীন সমাজে প্রচলিত নির্মম যৌতুকপ্রথার শিকার। যৌতুকপ্রথার কবলে পড়ে তার বিয়ে ভেঙে গেলেও সে ভেঙে পড়েনি। বরং সে যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদের প্রতীক। সে সহজ-সরল, শিক্ষিত ও প্রাণচঞ্চল চিত্তের অধিকারী। সে অন্যায়ের ক্ষেত্রে আপসহীন এক চরিত্র। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রচলিত নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সে সোচ্চার। 'অপরিচিতা' গল্পে সে একজন ত্যাগী ও দেশপ্রেমিক নারী চরিত্র।
*অনুপম: 'অপরিচিতা' গল্পের অন্যতম একটি চরিত্র অনুপম। সে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের সেই বাঙালি যুবক, যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর উপাধি অর্জন করেও ব্যক্তিত্বরহিত, পরিবারতন্ত্রের কাছে অসহায় পুতুলমাত্র। যৌতুককে কেন্দ্র করে যখন তার বিয়ে ভেঙে যায় তখন সে নীরব থাকে। পরিবারের কথার বাইরে সে কোনো কথা বলে না। পরে অবশ্য মামার অবাধ্য হয়ে সে বাইরে যায়, কল্যাণীরও দেখা পায়। তবে সে কল্যাণীকে প্রত্যাশার মতো করে পায় না। 'অপরিচিতা' গল্পের শেষ দিকে অনুপমকে ব্যক্তিত্বহীন চরিত্র থেকে চেতনাশীল চরিত্র হতে দেখা যায়।
*অনুপমের মামা: অনুপমের মামা অনুপমের পরিবারের প্রধান। তিনি অনুপমের চেয়ে বছর ছয়েক বড়। পুরো গল্পে মামাকে স্বার্থপর ও লোভী হিসেবে দেখা যায়। কল্যাণীর সঙ্গে অনুপমের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই মামার হীন মানসিকতা।
*শম্ভুনাথ সেন: 'অপরিচিতা' গল্পে শম্ভুনাথ সেন হলেন কল্যাণীর বাবা। তিনি একজন দৃঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তি। আত্মসম্মান রক্ষার্থে তিনি নিজের মেয়ের বিয়ে ভেঙে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। তিনি পেশায় একজন ডাক্তার।
*হরিশ: 'অপরিচিতা' গল্পে হরিশ চরিত্রটির পরিসর কম হলেও গুরুত্বপূর্ণ। হরিশ কানপুরে কাজ করে আর সে অনুপমের বন্ধু। অনুপম তার মুখেই প্রথম কল্যাণীর কথা শোনে। আর তার কাছে কল্যাণীর বর্ণনা শোনার পরই অনুপম কল্যাণীর প্রতি মুগ্ধ হয়ে যায়।
*বিনু: বিনু অনুপমের পিসতুতো ভাই। তার কথা বলা অত্যন্ত আঁট। তার রুচি ও দক্ষতার প্রতি অনুপমের ষোলো আনা ভরসা ছিল। তাই তার কথায় অনুপম অনেক বেশি মোহিত হয়।
*অনুপমের মা: 'অপরিচিতা' গল্পে অনুপমের মা একজন গরিবের ঘরের মেয়ে। স্বামীর ওকালতির টাকায় আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে বলে তারা যে ধনী এই কথা নিজেও ভোলেন না, আবার অনুপমকেও ভুলতে দেন না। তিনি অনুপমকে অনেক আদর-যত্নে মানুষ করেছেন। 'অপরিচিতা' গল্পে অনুপমের মাকে একজন অহংকারী চরিত্র হিসেবে পাওয়া যায়।
►বাংলা ছোটগল্পের উদ্ভব, বিকাশ, পূর্ণতা ও সমৃদ্ধি ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে।
►রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ষোলো বছর বয়সে প্রথম 'ভিখারিনী' ছোটগল্পটি লেখেন।
►রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক জমিদারি তদারকির সূত্রে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসেন। এখানে বসবাসকালকে তাঁর ছোটগল্প রচনার স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
►রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'অপরিচিতা' গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত মাসিক 'সবুজপত্র' পত্রিকায়।
►'অপরিচিতা' গল্পটি উত্তম পুরুষের জবানিতে বর্ণিত।
►'অপরিচিতা' গল্পটিতে যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
►'অপরিচিতা' গল্পে একদিকে পুরুষতন্ত্রের অমানবিকতা এবং অন্যদিকে পুরুষের ভাষ্যে নারীর প্রশংসা কীর্তিত হয়েছে।
►'অপরিচিতা' গল্পের নায়ক অনুপম উচ্চশিক্ষিত, তার বর্তমান বয়স সাতাশ বছর। যখন বিয়ের কথা হয়েছিল তখন তার বয়স ছিল তেইশ বছর।
►'অপরিচিতা' গল্পে অনুপমের বাবা উকিল ছিলেন।
►'অপরিচিতা' গল্পের নায়িকা কল্যাণী শিক্ষিতা, মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত; তার বর্তমান বয়স উনিশ বছর।
►'অপরিচিতা' গল্পে কল্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ সেন পেশায় ডাক্তার।
►'অপরিচিতা' গল্পে অনুপমের বিয়ের ঘটক হরিশ আসর জমাতে অদ্বিতীয়।
►'অপরিচিতা' গল্পে অনুপমের পিসতুতো দাদা বিনু কল্যাণীকে আশীর্বাদ করে ফিরে এসে বললেন, "মন্দ নয় হে! খাঁটি সোনা বটে।"
►'অপরিচিতা' গল্পে মা আর মামা দুজন অনুপমের অভিভাবক।
►'অপরিচিতা' গল্পে কল্যাণীর বিয়ের গহনা শম্ভুনাথ সেনের পিতামহীদের আমলের, তাই সেগুলো ছিল একেবারে খাঁটি।
►'অপরিচিতা' গল্পে কল্যাণীর আশীর্বাদে প্রদত্ত একজোড়া এয়ারিংয়ে সোনার ভাগ ছিল খুবই সামান্য।
►'অপরিচিতা' গল্পে অনুপম ব্যক্তিত্বরহিত ও মেরুদন্ডহীন; আর তার মামা ছিলেন অত্যন্ত লোভী ও হীনমতি।
►'অপরিচিতা' গল্পে "আমার মেয়ের গহনা আমি চুরি করিব এ কথা যারা মনে করে তাদের হাতে আমি কন্যা দিতে পারি না"-কথাটি বলেছিলেন শম্ভুনাথ সেন।
►'অপরিচিতা' গল্পে মায়ের সঙ্গে তীর্থযাত্রার সময় ট্রেনে যে অপরিচিত নারীকণ্ঠের "এই গাড়িতে জায়গা আছে" শুনে অনুপম মুগ্ধ ও আপ্লুত হয় সেই কণ্ঠটি কল্যাণীর।
►'অপরিচিতা' গল্পে "এ গাড়ি আগে হইতে রিজার্ভ করা, এ কথা মিথ্যা কথা।"- কল্যাণী ইংরেজিতে বলে স্টেশন মাস্টারকে।
►'অপরিচিতা' গল্পে কানপুরে নামার সময় অপরিচিতার নাম-পরিচয় জেনে অনুপম ও মা চমকে উঠলেন।
►'অপরিচিতা' গল্পে কানপুরে এসে অনুপম জেনেছে, কল্যাণী নারীশিক্ষার ব্রত গ্রহণ করেছে, তাই বিয়ে করবে না।
►'অপরিচিতা' গল্পে "দেখা হয়, সেই কণ্ঠ শুনি, যখন সুবিধা পাই কিছু তার কাজ করিয়া দিই- আর মন বলে, এই তো জায়গা পাইয়াছি।"- এই ভাবনা অনুপমের।
জটিল ও দুরূহ পাঠের ব্যাখ্যা
►"তবু ইহার একটু বিশেষ মূল্য আছে।"
সাতাশ বছর বয়স দৈর্ঘ্যের হিসাবে বা গুণের হিসাবে- কোনো দিক থেকেই বড় নয়। তবু এটার একটা বিশেষ মূল্য আছে। কেননা এই বয়সের নায়কটির ফুলের মতো বুকের উপর ভ্রমর এসে বসেছিল এবং সেই পদক্ষেপের ইতিহাস তার জীবনের মাঝখানে ফলের মতো গুটি ধরে উঠেছে। এই বিশেষ তাৎপর্যময় ঘটনাটিই তার সারা জীবনের সাথি হয়ে আছে।
►"ছোটোকে যাঁহারা সামান্য বলিয়া ভুল করেন না তাঁহারা ইহার রস বুঝিবেন।"
গল্পের নায়ক অনুপমের জীবনের মাত্র চার বছরের চমক-ইতিহাসটুকু ছোট। ছোট জলবিন্দুর মধ্যেই সিন্ধুর ব্যাপকতা থাকে, রসমাধুর্য থাকে। ওটুকু চয়ন করে নিতে হয়। তাই ছোটকে যারা সামান্য বলে ভুল করেন না, তারা এটার রস পান করে আনন্দ অনুভব করতে পারেন।
►"আমরা যে ধনী একথা তিনিও ভোলেন না, আমাকেও ভুলিতে দেন না।"
ধনী কথাটার মধ্যে এক ধরনের অহংকারবোধ যেমন আছে তেমনই অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মনোভাবও আছে। বিশেষ করে যারা গরিব থেকে হঠাৎ ধনী হয়, তাদের ক্ষেত্রে এ কথা বেশি খাটে। অনুপমের মায়ের স্বভাব ও মনোভাবের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। কারণ তিনি গরিব ঘরের মেয়ে, তাই হঠাৎ ধনী হওয়ার অহংকারটা নিজে যেমন ভোলেন না, তেমনই তার ছেলেকেও ভুলতে দেন না।
►"তাহাকে না খুঁড়িয়া এখানকার এক গণ্ডুষও রস পাইবার জো নাই।"
একটি সংসারের পুরো দায়িত্বে যিনি থাকেন, তিনিই জানেন কী দিয়ে কী হয়, কার জন্য কী দরকার। সংসারের সব বিষয় তার জানা থাকে। সেসব বিষয়ের ছিটেফোঁটা রস উদ্ঘাটন করতে চাইলে তাকে অনুসন্ধান করতে হয়। অনুপমদের সংসারের দায়িত্ব তার মামার ওপর। তাকে না খুঁড়ে এখানকার এক গন্ডুষও রস পাওয়ার উপায় নেই।
►"মাতার আদেশ মানিয়া চলিবার ক্ষমতা আমার আছে- বস্তুত, না মানিবার ক্ষমতা আমার নাই।"
গল্পের নায়ক অনুপমের বয়স যখন অল্প তখন তার বাবা মারা যান। তারপর থেকে মায়ের হাতেই সে মানুষ। মা তাকে তাঁর মনের মতো করে গড়ে তুলেছেন। তাই মায়ের আদেশ মেনে চলতেই সে অভ্যস্ত। তাঁর আদেশ না মানার মতো মানসিক সাহস কিংবা ক্ষমতা তার নেই।
►"তিনি এমন বেহাই চান যাহার টাকা নাই অথচ যে টাকা দিতে কসুর করিবে না।"
অনুপমের মামা শোষণ ও শাসন দুটিই ভালো বোঝেন। তিনি আত্মীয়তাও রাখতে চান অথচ তাকে যথাযথ সম্মান দিতে চান না। তিনি তার ভাগ্নের জন্য এমন ঘরের মেয়ে চান, যে এই বাড়িতে মাথা হেঁট করে আসবে। এমন বেয়াই চান, যার টাকা নেই অথচ টাকা দিতে কসুর করবে না, যাকে শোষণ করা যাবে, আবার গুড়গুড়ির পরিবর্তে হুঁকা দিলেও আপত্তি করবে না। বউ ও বেয়াই হবে তাদের বাড়ির সম্পূর্ণ অনুগত।
►"সুতরাং তাহারই পশ্চাতে লক্ষ্মীর ঘটটি একেবারে উপুড় করিয়া দিতে দ্বিধা হইবে না।"
হরিশের কাছ থেকে মেয়ে আর তার বাবা সম্পর্কে বর্ণনা শুনে অনুপমের মামা খুব খুশি হন। কারণ মেয়েটাই বাবার একমাত্র সন্তান। আর কেউ নেই। একসময় ধনে-মানে তাদের মঙ্গলঘট ভরা ছিল। এখন তলারটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। মামার ধারণা, মেয়ের জন্য লক্ষ্মীর মঙ্গলঘটটি একেবারে উপুড় করে দিতে তার বাবা সামান্যতমও দ্বিধা করবে না।
►"আমার ভাগ্যে প্রজাপতির সঙ্গে পঞ্চশরের কোনো বিরোধ নাই।"
হিন্দু শাস্ত্রমতে প্রজাপতি হলো বিয়ের প্রতীক আর পঞ্চশর তার বিপরীত। অনুপমের বিয়ের ক্ষেত্রে মনে হলো এদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। অনুপমের মামার সম্বন্ধটা পছন্দ হয় এবং তিনি অনুপমের বিনু দাদাকে পাঠালেন কন্যাকে আশীর্বাদ করার জন্য। তার রুচি ও দক্ষতার ওপর ষোলো আনা নির্ভর করা যায়। বিনুদাদা এসে জানাল, "মন্দ নয় হে! খাঁটি সোনা বটে!” এ কারণে বলা হয়েছে যে, এই বিয়ের ব্যাপারে প্রজাপতির সঙ্গে পঞ্চশরের কোনো বিরোধ নেই।
►"ভিড়ের মধ্যে দেখিলে সকলের আগে তাঁর উপরে চোখ পড়িবার মতো চেহারা।"
সুগঠিত অঙ্গসৌষ্ঠবের মানুষের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। শম্ভুনাথ সেন সেরকম চেহারার একজন মানুষ। বিয়ের তিনদিন আগে তিনি অনুপমকে প্রথম চোখে দেখেন এবং আশীর্বাদ করেন। তাঁর বয়স চল্লিশের কিছু এপারে বা ওপারে। চুল কাঁচা, গোঁফে পাক ধরতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে তিনি একজন সুপুরুষ। তাই ভিড়ের মধ্যেও সবার আগে চোখে পড়ার মতো বাহ্যিক ও ব্যক্তিত্ববান তাঁর চেহারা।
►"বেহাই-সম্প্রদায়ের আর যাই থাক, তেজ থাকাটা দোষের।"
বেহাই সম্প্রদায় বলতে এখানে কনের বাবা আর বরের বাবাকে বোঝানো হয়েছে। তাদের তেজ বা রাগ থাকাটা খুবই দোষের। তাতে দুই বেয়াইয়ের অভিমান বা জেদের ধাক্কা গিয়ে পড়ে নিরপরাধ বর-কনের ওপর। দুই বেয়াইয়ের অসন্তুষ্টিতে বর-কনেও প্রভাবিত হয়। ফলে তাদের মধ্যে মনকষাকষির ব্যাপার ঘটা অপ্রত্যাশিত নয়।
►"মামার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, তিনি কোনোমতেই কারও কাছে ঠকিবেন না।"
আড়ম্বরহীন বিয়েবাড়িতে ঢুকে মামা খুশি হলেন না। তার ওপর কনের বাবার টানাটানির যে কথা শুনেছিলেন, তাতে তার ধারণা হলো- লোকটা ঠকাতে পারেন। তাই তিনি বেয়াই মহাশয়কে বিয়ে শুরুর আগেই গহনার মান ও পরিমাণ যাচাই করার ব্যবস্থা করতে বললেন। কারণ তার মতে, বিয়ের পরে আর কোনো কথা তোলা যায় না। তার লক্ষ্য ছিল, তিনি কারও কাছে কোনোভাবেই ঠকবেন না।
►"ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করিবার ইচ্ছা আমার নাই।"
'বেয়াই' সম্পর্কটি ঠাট্টার সম্পর্ক। ছেলে-মেয়ের বিয়ের মাধ্যমে এ সম্পর্ক স্থায়ী হয়। কিন্তু কল্যাণী-অনুপমের বিয়ের মধ্য দিয়ে অনুপমের মামার সঙ্গে কল্যাণীর বাবা এ সম্পর্ক স্থায়ী করতে আগ্রহী নন। তাই বরপক্ষের খাওয়া-দাওয়ার পর শম্ভুনাথ সেন তেমন ভালো আয়োজন করতে পারেননি বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় দেওয়ার ইঙ্গিত দিলে বরের মামা অবাক হয়ে জানতে চান "ঠাট্টা করিতেছেন নাকি?" জবাবে শম্ভুনাথ সেন ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করার ইচ্ছা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। কারণ যারা মনে করে কন্যার বাবা গহনায় ফাঁকি দেবে, তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রশ্নই ওঠে না।
►"মস্ত বাংলাদেশের মধ্যে আমিই একমাত্র পুরুষ যাহাকে কন্যার বাপ বিবাহের আসর হইতে নিজে ফিরাইয়া দিয়াছে।"
বাংলাদেশে সাধারণত বর ও বরের বাবা কোনো কারণে কনেপক্ষের সাথে মতপার্থক্য হলে বিয়ের আসর থেকে চলে আসে অথবা কনেকে ত্যাগ করে। গল্পের নায়ক অনুপমের ক্ষেত্রেই এর বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। কেবল মামার অহংকারের কারণেই তার মতো ব্যক্তিত্বহীন পুরুষকে কন্যার বাবা বিয়ের আসর থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
►"বাহিরে তো সে ধরা দিলই না, তাহাকে মনেও আনিতে পারিলাম না।"
বিনুদাদার কল্যাণে অনুপমের বিয়ের আসরটা জমজমাট হয়ে উঠল। তার এমনই দুর্ভাগ্য যে, কনে আসার আগেই বিয়ে ভেঙে গেল। বিনুদাদার বর্ণনায় আকর্ষিত হয়ে কল্পনার দৃষ্টিতে তাকে দেখার সুযোগ সৃষ্টি হলেও তাকে চাক্ষুষ দেখার সুযোগই পেল না সে। বাইরে তো সে ধরা দিলই না, তাকে মনেও আনত পারল না অনুপম।
►"কিন্তু মানুষের মধ্যে যাহা অন্তরতম এবং অনির্বচনীয়, আমার মনে হয় কণ্ঠস্বর যেন তারই চেহারা।"
মানুষের মধ্যে যা অন্তরতম ও অনির্বচনীয় সেটার দর্পণ হচ্ছে তার গলার স্বর। তাই চিরকাল কণ্ঠস্বরই অনুপমের কাছে বড় সত্য। অনুপম মাকে নিয়ে তীর্থে বেরিয়েছিল। হঠাৎ একটা স্টেশনে শুনতে পেল, "শিগগির চলে আয়, এই গাড়িতে জায়গা আছে।" বাঙালি মেয়ের গলায় বাংলা কথা যে এমন মধুর হয়, অনুপম যেন আগে কখনো শোনেনি। এই কণ্ঠস্বরের মধ্য দিয়েই অপরিচিতার অন্তরতম ও অনির্বচনীয় চেহারা যেন তার কাছে প্রতিভাত হলো।
►"নবযৌবন ইহার দেহে মনে কোথাও ভার চাপাইয়া দেয় নাই।"
মিষ্টি সুরে 'এখানে জায়গা আছে' বলা মেয়েটিকে অনুপম এইমাত্র দেখল। এখনও তাকে সুর বলেই মনে হচ্ছে। দেখতে দেখতে চোখে পলক পড়ছে না। বয়স ষোলো-সতেরো হবে। সারা দেহে নবযৌবনের আভা ছড়িয়ে আছে। কিন্তু তা তাকে ভারাক্রান্ত করেনি অর্থাৎ তার দেহ-মনে কোথাও ভার চাপিয়ে দেয়নি। তার চলা ও বলার গতি সহজ-স্বচ্ছন্দ, দীপ্তি নির্মল, সৌন্দর্যের শুচিতা অপূর্ব, কোথাও কোনো জড়িমা নেই।
পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী সচ্ছন্দে চলতে গেলে বয়সের তফাতটা ভুলে থাকতে হয়। ছোটদের সঙ্গে মিষ্ট স্বরে কথা বলা মেয়েটির সঙ্গে ছিল আরও দু-তিনটি ছোট মেয়ে। তাদের সঙ্গে কল্যাণী অনায়াসে ও আনন্দে ছোট হয়ে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে ছেলেমানুষি কথায় ও হাসিতে সে উচ্ছল হয়ে উঠেছিল। বয়সের তফাতটা ধরে রাখলে এই হাসি-আনন্দ কিছুতেই করা হতো না। এটা তার বিশেষত্ব, তার মধ্যে বয়সের তফাত কিছুমাত্র ছিল না। তার এই মনোভাবটি প্রশংসার দাবিদার।
►"এখনো আশা ছাড়ি নাই, কিন্তু মাতুলকে ছাড়িয়াছি।"
কানপুরে নামার সময় মেয়েটির নাম-পরিচয় জানতে পেরে অনুপম ও তার মা দুজনই চমকে উঠল। তারপর অনুপম মামার নিষেধ অমান্য করে, মাতৃ আজ্ঞা ঠেলে কানপুরে চলে এলো। কল্যাণী ও তার বাবার সঙ্গে দেখা করে হাতজোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করল। শম্ভুনাথ বাবুর হৃদয় গলল। তাতে বিশেষ কোনো ফল হলো না। কল্যাণী স্পষ্ট জানিয়ে দিল সে বিয়ে করবে না। বিয়ের আশায় সে মাতুলকে ছেড়েছে, তবু কল্যাণীর আশা এখনও ছাড়েনি।
মায়ের সঙ্গে যাত্রাপথে রেলগাড়িতে ওঠার সময় কল্যাণীর কণ্ঠে প্রথম অনুপম শুনতে পায় "জায়গা আছে" কথাটি। "জায়গা আছে" কথাটি অনুপমের কাছে চিরজীবনের গানের ধুয়া হয়ে রয়েছে। কল্যাণীকে বিয়ে করতে পারেনি বলে অনুপমের কোনো কষ্ট নেই। সে বছরের পর বছর কল্যাণীর কাছাকাছি থাকে। দেখা হয়, কণ্ঠ শোনে আর সুযোগ পেলে তার ছোটখাটো কাজ সে করে দেয়। আর মনে মনে ভাবে, এই তো সে জায়গা পেয়েছে। যদিও তার সম্পূর্ণ পরিচয় পায়নি, আজও সে অপরিচিতা, তবুও ভাগ্য ভালো যে, সে জায়গা পেয়েছে।
