সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকণিকা
সাহিত্যে খেলা
প্রমথ চৌধুরী
সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যচর্চার আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজস্ব মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে আনন্দ দান করা, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে। শিল্পক্ষেত্রে বড় শিল্পীরা কখনো এক করতে আর এক করে ফেলেন না। সেজন্য তাঁদের সর্বক্ষেত্রে বিচরণ করার অধিকার আছে। তাঁদের মন উঁচুতেও উঠতে পারে, আবার নিচুতেও নামতে পারে। আর সাধারণ মানুষের মন স্বভাবতই যেখানে আছে সেটারই চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। তারা জানে একটু উঁচুতে না উঠলে কারও নয়ন-মন আকর্ষণ করা যায় না। আবার উঁচুতে ওঠার চেষ্টা করলেও তা পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে কষ্টকর হলেও আমাদের পক্ষে অবশ্য মনীষীদের পথ অনুসরণ করাই কর্তব্য। শিল্পরাজ্যে খেলা করার অধিকার ছোট-বড় সবারই সমান। তাই আমরা যদি একবার সাহস করে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করি তাহলে নির্বিবাদে সেই জগতের রাজ-রাজড়াদের দলে মিশে যাব।
কোনো উচ্চ আশা নিয়ে সেক্ষেত্রে উপস্থিত হলেই নিম্নশ্রেণিতে পড়ে যেতে হবে। সাহিত্যজগতে যাঁদের খেলা করার প্রবৃত্তি আছে, সাহস আছে, ক্ষমতা আছে- মানুষের নয়ন-মন আকর্ষণ করার সুযোগ বিশেষ করে তাঁদের কপালেই ঘটে। সাহিত্যের রসাস্বাদন করে মানুষ স্বেচ্ছায় ও আনন্দে। শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞানের বিষয় জানানো আর সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনে সাড়া জাগানো। প্রবন্ধটিতে মূলত তা-ই ফুটে উঠেছে।
|
নাম |
প্রকৃত নাম : |
প্রমথ চৌধুরী। |
|
ছদ্মনাম : |
বীরবল। |
|
|
জন্ম পরিচয় |
জন্ম তারিখ: |
৭ই আগস্ট, ১৮৬৮ সাল। |
|
জন্মস্থান: |
যশোর। |
|
|
পৈতৃক নিবাস: |
হরিপুর, পাবনা। |
|
|
পিতৃ-পরিচয় |
পিতার নাম: |
দুর্গাদাস চৌধুরী। |
|
পেশা: |
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। |
|
|
শিক্ষাজীবন |
মাধ্যমিক: |
এন্ট্রান্স, কলকাতা হেয়ার স্কুল। |
|
উচ্চ মাধ্যমিক: |
এফএ, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। |
|
|
উচ্চতর: |
বিএ (অনার্স) দর্শন, ১৮৮৯ সাল; এমএ (ইংরেজি), ১৮৯০ সাল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; বার-এট ল, ইংল্যান্ড। |
|
|
কর্মজীবন/পেশা |
অধ্যাপনা: |
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজ। |
|
|
রিসিভার: |
দক্ষিণেশ্বর ও গোপাল পাল এস্টেট। |
|
ম্যানেজার: |
ঠাকুর এস্টেট। |
|
|
সম্পাদনা: |
মাসিক 'সবুজপত্র', 'বিশ্বভারতী পত্রিকা' প্রভৃতি। |
|
|
সাহিত্যকর্ম |
কাব্যগ্রন্থ: |
সনেট পঞ্চাশৎ, পদচারণ। |
|
গল্পগ্রন্থ: |
চার-ইয়ারী-কথা, আহুতি, নীললোহিত, গল্পসংগ্রহ প্রভৃতি। |
|
|
প্রবন্ধগ্রন্থ: |
তেল-নুন-লকড়ি, বীরবলের হালখাতা, নানাকথা, আমাদের শিক্ষা, রায়তের কথা, প্রবন্ধসংগ্রহ প্রভৃতি। |
|
|
বিশেষ কৃতিত্ব |
তিনি বাংলা গদ্যসাহিত্যে চলিত রীতি এবং কাব্যসাহিত্যে ইতালীয় সনেটের প্রবর্তন করেন। |
|
|
পুরস্কার |
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত 'জগত্তারিণী স্বর্ণপদক' লাভ। |
|
|
জীবনাবসান |
২রা সেপ্টেম্বর, ১৯৪৬ সাল (কলকাতা)। |
|
এক নজরে পাঠের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু
প্রমথ চৌধুরীর 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় 'সবুজপত্র' পত্রিকার শ্রাবণ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায়। পরে তা তাঁর 'প্রবন্ধসংগ্রহ' (১৯৫২) গ্রন্থে সংকলিত হয়। এই প্রবন্ধে সাহিত্যচর্চার আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখকের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট পরিচয় ফুটে উঠেছে।
'সাহিত্যে খেলা'- এই নামকরণ থেকেই বিষয়বস্তু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাহিত্যকে লেখক এক ধরনের খেলা হিসেবে দেখেছেন। খেলাধুলায় যেমন নিছক আনন্দই প্রধান, সাহিত্যেও তাই। খেলাধুলায় যেমন আনন্দ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই, সাহিত্যের উদ্দেশ্য তেমনই একমাত্র আনন্দ দান করা। সাহিত্যের প্রকৃত স্বরূপ অর্থাৎ আদর্শ ও উদ্দেশ্যের সুবিস্তৃত রূপরেখা প্রদর্শন করতে গিয়েই লেখক 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধ রচনার প্রয়াস পেয়েছেন। এই প্রবন্ধে লেখক তাঁর বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করতে গিয়ে নানা রকম ঘটনা, উপঘটনা ও বহু উদাহরণের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি এসব দৃষ্টান্তের মধ্য দিয়ে সাহিত্যের মূল লক্ষ্য আনন্দের স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেন। প্রমাণ করেছেন সাহিত্যশিল্প আসলেই লেখক-শিল্পীর মগ্ন হৃদয়ের খেলা। সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দদান করা, কারও মনোরঞ্জন করা নয়।
প্রবন্ধের সমগ্র আলোচনায় প্রমথ চৌধুরী নানা উদাহরণের মাধ্যমে সাহিত্যের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন এবং সাহিত্য যে সত্যিকার অর্থেই সাহিত্য, সাহিত্য যে আনন্দদানের খেলাস্বরূপ তা প্রমাণ করেছেন। কাজেই প্রবন্ধের নামকরণ 'সাহিত্যে খেলা' সুন্দর, সার্থক এবং যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
♦'সাহিত্যে খেলা' প্রথম প্রকাশিত হয় 'সবুজপত্র' পত্রিকার ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ) শ্রাবণ সংখ্যায়।
♦'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধটি সংকলিত হয়েছে- 'প্রবন্ধসংগ্রহ' গ্রন্থে (১৯৫২)।
♦বেদিতে না বসলে আমাদের উপদেশ কেউ মানে না।
♦একমাত্র খেলার ময়দানে এ পৃথিবীতে ব্রাহ্মণ-শূদ্রের প্রভেদ নেই।
♦স্বর্গ হতে দেবতারা ভূতলে অবতীর্ণ হওয়াতে কেউ আপত্তি করেন না, কিন্তু মর্ত্যবাসীদের পক্ষে রসাতলে গমন করাটা বিশেষ নিন্দনীয়।
♦যিনি গড়তে জানেন, তিনি শিবও গড়তে পারেন, বাঁদরও গড়তে পারেন।
♦মন উঁচুতেও উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায়।
♦সত্যকথা বলতে গেলে, সাধারণ লোকের মন স্বভাবতই যেখানে আছে তারই চারপাশে ঘুরে বেড়াতে চায়।
♦যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওনার আশা আছে তার নাম জুয়াখেলা।
♦সাহিত্যের উদ্দেশ্য সবাইকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়।
♦কাব্যজগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা।
♦বিশ্বমানবের সঙ্গে নিত্যনতুন সম্বন্ধ পাতানোই হচ্ছে কবিমনের নিত্যনৈমিত্তিক কর্ম।
♦মুনি-ঋষিদের জন্য বাল্মীকি আদিতে রামায়ণ রচনা করেছিলেন।
►"আমাদের পক্ষে অবশ্য মহাজনদের পথ অনুসরণ করাই কর্তব্য।"
পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত হয়েছেন তাঁরা কখনো অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আপনাকে দৃষ্টিনন্দিত ও কৌশলী করেননি। চেষ্টা করতে করতে এবং অধ্যবসায়ের গুণে খেলতে খেলতে তাঁরা বিজ্ঞ, জ্ঞানী, মহাজ্ঞানী, মহাজন ও জগৎখ্যাত হয়েছেন। তাঁরা কখনো দর্শক ও শ্রোতৃমণ্ডলীর নয়নমন আকর্ষণ করার জন্য উঁচুতে চড়েননি, উপদেশ মানাতে গিয়ে বেদিতে বসেননি, বক্তৃতা শোনাতে কাষ্ঠমঞ্চে দাঁড়াননি, অভিনয় দেখানোর জন্য রঙ্গমঞ্চেও চড়েননি। এই মহাজ্ঞানী, মহাজনদের পথ অনুসরণ করলেই জীবনে সার্থকতা আসবে। তাই আমাদের পক্ষে অবশ্যই মহাজনদের পথ অনুসরণ করাই কর্তব্য।
►"তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না।”
যে লেখক সাহিত্যক্ষেত্রে ফলের চাষ করতে ব্রতী হন, যিনি কোনোরূপ কার্য-উদ্ধারের অভিপ্রায়ে লেখনী ধারণ করেন, তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্মও বোঝেন না। প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে আনন্দদান করা, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। তাই সাহিত্য রচনা করে অন্য কোনো ফল আশা করা ঠিক নয়। কেননা সাহিত্যের উদ্দেশ্য শিক্ষা দান করা নয়। তাছাড়া শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞানের বিষয় জানানো; পক্ষান্তরে সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনে সাড়া জাগানো। তাই সাহিত্যের সঙ্গে খেলাধুলার তুলনা চলে। খেলাধুলায় যেমন নিছক আনন্দই প্রধান, সাহিত্যেও তাই। তাই সাহিত্য রচনা করে আনন্দ ছাড়া অন্য কোনো ফল আশা করা অনুচিত। কেননা যে খেলার ভিতর আনন্দ নেই কিন্তু উপরি পাওনার আশা আছে, তার নাম খেলা নয়, জুয়াখেলা। আর সমাজের মনোরঞ্জন বা অন্য কোনো ফল পেতে গেলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে।
►"সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূত।"
পরমাত্মা নিজেই বলেছেন, যদিও তাঁর কোনোই অভাব নেই তবুও তিনি এই বিশ্ব সৃজন করেছেন। শুধু তাঁর লীলাখেলার জন্য বা আনন্দের জন্যই স্রষ্টা এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ স্রষ্টার সৃষ্টি তাঁর লীলামাত্র। সেক্ষেত্রে কবির সৃষ্টিও এই বিশ্বসৃষ্টির অনুরূপ। কেননা কবির সৃজনের মূলে কোনো অভাব দূর করার অভিপ্রায় নেই, আছে শুধু অন্তরাত্মার স্ফূর্তি এবং তার আনন্দ ফল উপভোগ করা। ফলে কবি বা জীবাত্মা সাহিত্য সৃষ্টি করে আনন্দ পায় বা সাহিত্য খেলার মধ্যে সে সুখ পায়। তাই জীবাত্মার লীলামাত্রই এই সাহিত্য সৃষ্টি, যা অনেকটা পরমাত্মার বা স্রষ্টার বিশ্বসৃষ্টির নামান্তর। অতএব সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র এবং সেই লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূত।
►"মন উঁচুতে উঠতে চায়, নীচুতেও নামতে চায়।"
মানুষের মন বিচিত্র বলেই উঁচুতে উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায়। কথায় বলে, "মানুষের মন আর আকাশের রং সমান।" মানুষের মন যে কখন কী পেতে চায় তা বুঝে ওঠা দুঃসাধ্য। প্রকৃত অর্থে মানুষের মন বড় বিচিত্র। তবে সাধারণ লোকের মন স্বভাবতই যেখানে আছে তারই চারপাশে ঘুরে বেড়াতে চায়; উঠতেও চায় না, ডুবতেও চায় না। তবে যাঁদের মন উঁচুতে উঠতে চায়, নিচুতেও নামতে চায় তারা নিজেদের চারপাশ সম্পর্কে ধারণা পেতে চায়, উদ্দেশ্য সফল করতে চায়। আবার মণি-মুক্তা কুড়িয়ে আনতে সমুদ্রের তলদেশেও নামতে চায়। এসব কারণে কোনো কোনো চিন্তাবিদ মানুষের মনকে একটি অন্ধকার ঘরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কারণ অন্ধকার ঘর যেমন রহস্যজনক, সেখানকার কোথায় কী আছে তা বলা মুশকিল, তেমনই মানুষের মনও বড় রহস্যময়।
►"পৃথিবীর শিল্পী মাত্রেই এই শিল্পের খেলা খেলে থাকেন।"
পৃথিবীর সব শিল্পীই শিল্পের খেলার মধ্য দিয়েই দক্ষতা ও নৈপুণ্য অর্জন করেন এবং বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। রোদ্যা কাদামাটি নিয়ে খেলাচ্ছলে পুতুল তৈরি করতেন। এটি ছিল তাঁর নিছক একটি খেলা। সাহিত্যকে তথা শিল্পকে খেলার সঙ্গে তুলনা করার জন্য 'সাহিত্যে খেলা' প্রবন্ধে লেখক রোদ্যার প্রসঙ্গ টেনেছেন। এতে শিল্প-সাহিত্যের আদর্শ ও উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট হয়েছে। কাদামাটি দিয়ে পুতুল তৈরি করে তিনি নিজে যেমন আনন্দ পেয়েছেন তেমনই অন্যকেও আনন্দদান করেছেন। পাষাণ দেহে তিনি এমন শিল্প নির্মাণ করেছেন যা জীবন্ত মনে হয়। শুধু রোদ্যা নন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও প্রকৃত শিল্পী মাত্রই এই খেলা খেলে থাকেন। কারণ তারা দক্ষতাগুণে যেমন শিবমূর্তি গড়তে জানেন, তেমনই বাঁদরমূর্তিও গড়তে জানেন।
►"সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়।"
এখানে লেখক সাহিত্যের উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত সেটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। সাহিত্যের জগৎ নিছক আনন্দের জগৎ। মানুষ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে এই জগতে বিচরণ করে। লেখকের মতে, একমাত্র আনন্দের জন্যই সাহিত্য রচনা করা উচিত। যারা জাগতিক কোনো লাভের আশায় সাহিত্য সৃষ্টি করে তারা সাহিত্যজগতের কলঙ্ক। তাদের জন্য সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য পথভ্রষ্ট হয়। তারা পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য সাহিত্য রচনা করে। ফলে সাহিত্য হয়ে পড়ে ছেলের হাতের খেলনা। তবে লেখক মনে করেন, কবির সৃষ্টি বিশ্বসৃষ্টিরই অনুরূপ। বিশ্বসৃষ্টি যেমন স্রষ্টার লীলামাত্র, সাহিত্য সৃষ্টিও তেমনই সাহিত্যিকের লীলা-খেলা মাত্র। সেই খেলায় যদি কোনো উপরি পাওনার আশা থাকে, তবে তা জুয়াখেলারই নামান্তর। তাই সাহিত্য সৃষ্টিতে অভাব দূর করার অভিপ্রায় থাকা উচিত নয়। প্রমথ চৌধুরীর ভাষায়, সাহিত্য সৃষ্টির মূল- অন্তরাত্মার স্ফূর্তি এবং তার ফল-আনন্দ। সেজন্যই বলা হয়েছে- "সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়।"
►"শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মনকে বিশ্বের খবর জানানো, সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো।"
লেখক এখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য পরিবেশন করেছেন। লেখক সাহিত্য ও শিক্ষাকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখিয়েছেন। শিক্ষা মানুষ অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলাধঃকরণ করে; অন্যদিকে সাহিত্যের রস মানুষ স্বেচ্ছায় পান করে। লেখকের মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য অনাবিল আনন্দদান করা, শিক্ষা দেওয়া নয়। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের পরিধি প্রসারিত হয়। বিশ্বের খবরাখবর পরিবেশন করে মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির কাজটি শিক্ষার মাধ্যমে হয়। শিক্ষার সঙ্গে জ্ঞানচর্চার সম্পর্ক বিদ্যমান। পক্ষান্তরে সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো। অন্যের মনের অভাব পূরণ করার উদ্দেশ্যেই শিক্ষার জন্ম, আর সাহিত্যের জন্ম মানবমনের পরিপূর্ণতা থেকে।
►"সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।"
সাহিত্যের জগৎ নিছক আনন্দের জগৎ। মানুষ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে এই জগতে বিচরণ করে। সাহিত্য নিয়ে খেলা করার অধিকার আমাদের সবারই আছে। কিন্তু তাই বলে তা ছেলের হাতের খেলনা নয়। আমরা চাইলেই সাহিত্যকে পণ্যে পরিণত করতে পারি না। অনেক ইতর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাহিত্যিক সাহিত্যকে জাগতিক লাভালাভের সাথে যুক্ত করেছে। ফলে সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়েছে। তাদের কারণে সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনার মতো ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে সাহিত্য গুরুর হাতের বেতের মতো ভীতিকর কোনো কিছুও নয়। স্কুল শিক্ষকরা বেতের মাধ্যমে সাহিত্য আত্মস্থ করাতে চান বলে শিক্ষার্থীদের কাছে সাহিত্য বেতের মতোই ভীতিপ্রদ। শিক্ষকরা সাহিত্যকে বেছে নিয়েছেন শিক্ষার হাতিয়ার হিসেবে। এ কারণে লেখক বলেছেন, "সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।"
►কাব্যরসে অরুচি: হৃদয়বান ব্যক্তিরা কাব্যের রস উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু স্কুল-কলেজে কাব্যকে রস আস্বাদনের জন্য পড়ানো হয় না, পড়ানো হয় শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। আর শিক্ষা লাভ কেউ স্বেচ্ছায় করে না। ফলে কাব্যরসে অরুচি ধরে।
►সাহিত্যের উদ্দেশ্য: সাহিত্যের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আনন্দ দেওয়া, কারও মনোরঞ্জন করা নয়। আনন্দ দান ও মনোরঞ্জনের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। আবার সাহিত্যের উদ্দেশ্য কাউকে শিক্ষা দান করাও নয়। কেননা সাহিত্যিকের মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্যের মনের অভাব পূরণ করতে শিক্ষকের হাতে শিক্ষার জন্ম হয়েছে। আর কবির মনের পরিপূর্ণতায় সাহিত্যের উৎপত্তি। সাহিত্যের উদ্দেশ্য কেবল আনন্দ দান করা, শিক্ষাদান করা নয়।
►সাহিত্যে খেলা: সাহিত্যে খেলা বলতে সাহিত্যকে খেলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। খেলা যেমন উদ্দেশ্যহীনভাবে নিছক আনন্দ লাভের জন্য করা হয়, তেমনই সাহিত্যকেও হতে হয় উদ্দেশ্যহীন। খেলায় যদি কোনো লাভ যুক্ত করা হয় তাহলে সেটি খেলা থাকে না, সেটি হয়ে যায় জুয়া খেলা। তেমনই কোনো লাভের উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা করলে সেটি আর সাহিত্য গুণসম্পন্ন থাকে না। তখন সেটি অনিষ্ট হয়।
