বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর
বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১। "লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে।" ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: "লেখা ভালো হইলে যশ আপনি আসিবে"- বলতে লেখক জম্ম প্রতি মনোযোগী না হয়ে লেখার মানের দিকে গুরুত্ব দিলে যশ নিজেই এসে ধরা দেয় সেই দিকটি বুঝিয়েছেন।
'বঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক নব্য খকদের লেখার মানের প্রতি মনোযোগী হতে বলেছেন। লেখক ঘন করেন, লেখার মান ভালো হলে খ্যাতির পেছনে দৌড়াতে হয় খ্যাতি নিজেই এসে ধরা দেয়। লেখার মান ঠিক না রেখে কেবল জাতির পেছনে ছুটলে লেখাও ভালো হয় না, খ্যাতিও আসে না। এই বিরটি বোঝাতেই লেখক প্রশ্নোক্ত উক্তিটি করেছেন।
প্রশ্ন ২। লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় টাকার জন্য লিখতে নিষেধ করেছেন কেন?
উত্তর: টাকার জন্য লিখতে গেলে লোকরঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হয়ে উঠে বলেই লেখক টাকার জন্য লিখতে নিষেধ করেছেন।
বঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধের লেখক মনে করেন- অর্থের জন্য লেখার সময় এখনও আমাদের দেশে আসেনি। যদিও ইউরোপের অনেক লেখক টাকার জন্য লেখেন। আমরা অর্থের জন্য লিখতে গেলে লোকরঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হবে। কারণ আমাদের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি এমন পর্যায়ে রয়েছে, সেখানে লোকরঞ্জন করতে গেলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হতে পারে। তাই প্রবন্ধিক অর্থের জন্য লিখতে নিষেধ করেছেন।
প্রশ্ন ৩। "সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।" কী কারণে? তা ব্যক্ত করো।
উত্তর: "সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য।"- কথাটি বলতে বোঝানো হয়েছে যে, সত্য ও ন্যায়ে প্রতিষ্ঠা করাই সাহিত্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
বঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে নতুন লেখকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন- সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্যে সত্য প্রতিষ্ঠা করা। তাই সমাজের পক্ষে যা অসত্য, নীতিবহির্ভূত, স্বাৰ্থকেন্দ্রিক, অন্যকে পীড়ন করে- এমন সবকিছুই সাহিত্যে সর্বতোভাবে বর্জনীয়। সমাজের জন্য যা কল্যাণকর, আত্মিক উন্নতিতে যা ভূমিকা রাখতে পারে এমন সত্য ও মহৎ বিষয়ই সাহিত্যে স্থান পেতে পারে। তাই সত্য ও ধর্মের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠাই সাহিত্যের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
উত্তর: যশ বা টাকার জন্য না লিখে মানবকল্যাণে লেখাকে বঙ্কিমচন্দ্র লেখকের আদর্শ হওয়া উচিত বলে মনে করেন।
'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক বাংলা সাহিত্যের নতুন লেখকদের আদর্শ কী হওয়া উচিত সেটি সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, খ্যাতি বা অর্থের উদ্দেশ্য নয়, লিখতে হবে মানুষের কল্যাণে কিংবা সৌন্দর্য সৃষ্টির অভিপ্রায়ে। যা কিছু অসত্য, নীতিনৈতিকতা বিরোধী, স্বার্থতাড়িত সেসব বর্জন করা বাঞ্ছনীয়। অনুকরণ প্রবৃত্তি বা নিজেকে জাহির করার প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে হবে। এসব বিষয় মেনে চলাই লেখকের আদর্শ হওয়া উচিত বলে মনে করেন প্রাবন্ধিক বঙ্কিমচন্দ্র।
প্রশ্ন ৫। কোন প্রবন্ধ কখনো হিতকর হতে পারে না?
উত্তর: ব্যক্তিগত স্বার্থোদ্ধার বা পরপীড়নের উদ্দেশ্যে রচিত প্রবন্ধ কখনো হিতকর হতে পারে না।
'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে নতুন লেখকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন- সাহিত্যের উদ্দেশ্য সত্য ও ধর্ম। তাই সাহিত্য রচনার সময় কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি বা মানবমঙ্গলের কথা ভাবাই বাঞ্ছনীয়। সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য থেকে অনেক লেখকই বিচ্যুত হয়ে পড়েন। তাদের রচনায় ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার এমনকি মানুষের অনিষ্ট সাধনের মতো নিন্দনীয় বিষয়গুলো মুখ্য হয়ে ওঠে। এ ধরনের রচনা সমাজের জন্য বিশেষ ক্ষতিকর।
প্রশ্ন ৬। "যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না।"- বঙ্কিমচন্দ্রের এ পরামর্শের কারণ কী?
উত্তর: "যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না"- উক্তির মাধ্যমে লেখক নতুন লেখকদের লেখা কিছুদিন ফেলে রেখে সংশোধন করার পরামর্শ দিয়েছেন।।
প্রাবন্ধিক উৎকৃষ্ট মানের লেখা সৃষ্টির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধারণত নতুন কোনো লেখা সম্পূর্ণ করার পর তাতে কিছু ত্রুটি থেকে যেতে পারে। সেই ত্রুটি তাৎক্ষণিক নজরে আসে না। তাই প্রাবন্ধিক কোনো প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস লেখার পর এক-দুই বছর ফেলে রাখতে অর্থাৎ চোখের আড়ালে রাখতে বলেছেন। এক-দুই বছর পর লেখাটির অনেক ত্রুটি নজরে পড়বে। তখন লেখার ত্রুটিগুলো সংশোধন করলে রচনা বিশেষ উৎকর্ষ লাভ করে।
বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তর দেখুন
প্রশ্ন ৭। সাহিত্য রচনার পর দুই এক বছর ফেলে রেখে সংশোধন করা উচিত কেন?
উত্তর: সাহিত্য রচনার পর দুই এক বছর ফেলে রেখে সংশোধন করা উচিত। কারণ কাব্য, নাটক, উপন্যাস ইত্যাদি দুই এক বছর ফেলে রেখে সংশোধন করলে এগুলোর উৎকর্ষ বৃদ্ধি পায়।
কাব্য, নাটক ও উপন্যাসে লেখকের মনের অনুভূতি, জীবনের অভিজ্ঞতা, চারপাশের জীবন, প্রকৃতি ইত্যাদি নানা বিষয় স্থান পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটে, অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়। তাই এসব সাহিত্য রচনার পর দীর্ঘ সময় ফেলে রেখে সংশোধন করলে তা উন্নততর সৃষ্টিকর্মে পরিণত হয়। তাছাড়া লেখকের অনেক ভুলত্রুটিও এ সময়ের মধ্যে ধরা পড়ে। এ কারণেই সাহিত্য রচনার পর দুই এক বছর ফেলে রেখে সেগুলো সংশোধন করা উচিত।
প্রশ্ন ৮। সাময়িক সাহিত্য লেখকের পক্ষে অবনতিকর কেন? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সাময়িক সাহিত্য লেখকের লেখার মানোন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতাস্বরূপ বলে তা লেখকের পক্ষে অবনতিকর।
প্রাবন্ধিক মনে করেন, সাময়িক সাহিত্য স্বল্পকালীন চাহিদা মেটানোর জন্য সৃষ্টি। এ লেখাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে লিখে খুব দ্রুতই প্রকাশ করতে হয়। এ কারণে লেখক লেখাগুলোকে যথাযথভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পান না। উৎকৃষ্ট মানের রচনা সৃষ্টির জন্য রচনা লেখার পর পর্যাপ্ত সময় নিয়ে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। সাময়িক সাহিত্যে ব্রতী লেখকরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকেন। এ কারণেই সাময়িক সাহিত্য লেখকদের পক্ষে অবনতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্ন ৯। "যে বিষয়ে যাহার অধিকার নাই, সে বিষয়ে তাহার হস্তক্ষেপ অকর্তব্য।”- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটির মধ্য দিয়ে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন যার যে বিষয়ে জ্ঞান বা দক্ষতা নেই তার সেই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক বলেছেন যে, সাময়িক সাহিত্য মূলত ঘটে যাওয়া সমসাময়িক ঘটনা কিংবা বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়। তবে যারা এই সাময়িক সাহিত্য রচনা করেন তাদের অনেকেরই সেসব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান বা দক্ষতা থাকে না। তারা অতিশয় ভাবাবেগে আচ্ছন্ন হয়ে রচনা করেন। ফলে তা উৎকৃষ্ট মনে হয় না। তাই লেখক মনে করেন, যার যে বিষয়ে দক্ষতা বা অধিকার নেই, তার সেই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
প্রশ্ন ১০। বিদ্যা প্রকাশ সম্পর্কে লেখকের অভিমত কী?
উত্তর: বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা পাঠকের জন্য বিরক্তিকর এবং তা রচনার পারিপাট্যের ব্যাঘাত ঘটায় বলে লেখক বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টাকে নিষেধ করেছেন।
প্রাবন্ধিক মনে করেন, সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হলো নিছক আনন্দ দান। সংগত কারণেই এটি শিক্ষাদানের বিষয় নয়। তাছাড়া বিদ্যা থাকলে লেখার মধ্যে তা এমনিতেই প্রকাশ পায়। এর জন্য চেষ্টার দরকার হয় না। উপরন্তু রচনায় জোর করে বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করলে তা লেখার পারিপাট্যকে বিঘ্নিত করে এবং পাঠকের মনেও বিরক্তির উদ্রেক করে। তাই আলোচ্য প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক রচনায় বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টাকে নিষেধ করেছেন।
প্রশ্ন ১১। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সরলতাকে সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার বলেছেন কেন?
উত্তর: সহজ-সরল ভাষাই রচনার শ্রেষ্ঠ অলংকার- এই বিষয়টি বোঝাতে লেখক উক্তিটি করেছেন।
লেখকের উদ্দেশ্য থাকে মনের ভাব পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, রচনার ভাষা এত জটিল হয়ে পড়ে যে, পাঠক তা বুঝতে পারেন না। যিনি সোজা কথায় মনের ভাব পাঠককে বোঝাতে পারেন তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক। কারণ লেখার উদ্দেশ্য হলো সরল ভাষায় পাঠককে বোঝানো। এই দিক বিবেচনা করে লেখক প্রশ্নোক্ত কথাটি বলেছেন।
প্রশ্ন ১২। "ভান্ডারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না।"- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: "ভান্ডারে না থাকিলে মাথা কুটিলেও আসিবে না”- উক্তিটিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অলংকার ও ব্যঙ্গ প্রয়োগে লেখকের স্বাভাবিক দক্ষতার বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন।
রচনার সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে লেখকগণ অলংকার ও ব্যঙ্গ প্রয়োগ করেন। এ দুটির ব্যবহারে লেখকের মুনশিয়ানার প্রকাশ ঘটে। যার মাঝে এ সম্পর্কিত সূক্ষ্ম জ্ঞান আছে তার লেখায় স্বাভাবিকভাবেই এ দুটি বিষয় -সুন্দরভাবে আসে। অন্যদিকে অলংকার বা ব্যঙ্গের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে অনেক ভেবেও এগুলোর সঠিক প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। আবার এগুলো ইচ্ছামতো বা জোরপূর্বক যেখানে সেখানে বসালে রচনার শিল্পগুণ নষ্ট হয়। এ কারণেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকণিকা দেখুন
প্রশ্ন ১৩। "অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না।"-ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: অনুকরণপ্রিয়তার নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরতে গিয়ে লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
অনেক নবীন লেখকই প্রতিষ্ঠিত লেখকদের অনুকরণে সাহিত্য রচনা করতে চান। তাই তারা প্রতিষ্ঠিত লেখকের রচনার দোষ-ত্রুটি সহজে আয়ত্ত করেন। গুণগুলো উপেক্ষিতই রয়ে যায়। অনুকরণবৃত্তির এটিই বৈশিষ্ট্য। অনুকরণ করতে গেলে অন্যের ত্রুটিগুলোই বেশি আকর্ষণ করে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রশ্নোক্ত কথাটির মাধ্যমে অনুকরণবৃত্তির এ সমস্যাটি নির্দেশ করেছেন।
প্রশ্ন ১৪। "যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না।"- উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: "যে কথার প্রমাণ দিতে পারিবে না, তাহা লিখিও না।" বলতে লেখক প্রমাণহীন অযৌক্তিক লেখা না লেখার কথা বলেছেন।
'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধে লেখক রচনার বস্তুনিষ্ঠতার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। যে কথার প্রমাণ নেই লেখক নতুন লেখকদের তা লিখতে নিষেধ করেছেন। লেখার প্রয়োজনে অনেক কথাই রচনায় জানতে হয়। তবে যুক্তি-প্রমাণহীন কোনো কথাই রচনায় যুক্ত করা ঠিক নয় বলে লেখক মনে করেছেন। আর এ ক্ষেত্রে তিনি নতুন লেখকদের হাতে প্রমাণ থাকার কথা বলেছেন।
প্রশ্ন ১৫। "বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা।”- ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রশ্নোক্ত কথাটির মধ্য দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালির জীবনে বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন।
ভাষার সাহায্যে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে। মনের ভাব প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম হচ্ছে মাতৃভাষা। মায়ের মুখে শেখা বুলিতেই মানুষ নিজের অনুভূতি জানাতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মাতৃভাষাতেই মানুষ কথা বলে সবচেয়ে তৃপ্তি লাভ করে। মাতৃভাষার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক আছে বলে মানুষের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মাতৃভাষা। বাঙালির শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সমস্ত সৃজনশীল ও মননশীল কর্মকাণ্ডের মূলে রয়েছে মাতৃভাষা বাংলা। এ বিবেচনা থেকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।
প্রশ্ন ১৬। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বস্তুনিষ্ঠতার ওপরগুরুত্বারোপ করেছেন কেন?
উত্তর: উৎকৃষ্ট রচনা নির্মাণে বস্তুনিষ্ঠতার বিকল্প নেই বলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বস্তুনিষ্ঠতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রাবন্ধিক মনে করেন, বস্তুনিষ্ঠ লেখা বলতে সেই লেখাকে বোঝায় যে লেখা সত্যাশ্রয়ী, যে লেখা কোনো স্বার্থের আশায় লেখা হয়নি এবং যে লেখায় পরিবেশিত তথ্যসমূহ শতভাগ শুদ্ধ। সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানবকল্যাণ। মানবকল্যাণ নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে লেখার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা আবশ্যক। এ কারণেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনায় বস্তুনিষ্ঠতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রশ্ন ১৭।. সাহিত্য রচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সাহিত্য রচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ ও সৌন্দর্য সৃষ্টি।
প্রাবন্ধিক সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্যের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য অত্যন্ত মহৎ। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে লেখকের কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি অথবা মানবমঙ্গলের কথাই বিবেচনায় রাখা উচিত। মূলত এ দুটিই জীবনের প্রকৃত সত্য। ধর্মের মর্মমূলেও রয়েছে এ দুটির উপস্থিতি। সাহিত্যের উদ্দেশ্য এ কারণেই সত্য ও ধর্ম ছাড়া অন্য কিছুই নয়।
প্রশ্ন-১৮। 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধটির সর্বকালীন ও বৈশ্বিক আবেদন রয়েছে কেন?
উত্তর: 'বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন' প্রবন্ধটি যেকোনো কালের, যেকোনো স্থানের লেখকের জন্য আদর্শস্বরূপ।
আলোচ্য প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে নবীন লেখকদের উদ্দেশে নিবেদন করেছেন। উনিশ শতকের শেষভাগে রচিত হলেও রচনাটির প্রাসঙ্গিকতা সমকালেও বিদ্যমান। রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্য রচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং আদর্শ, লেখকের করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে বিভিন্ন উপদেশ দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শগুলো যেকোনো দেশের, যেকোনো ভাষার লেখকের জন্যই প্রযোজ্য।
প্রশ্ন-১৯। লেখক প্রাঞ্জলতাকে রচনার সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার আখ্যা দিয়েছেন কেন?
উত্তর: প্রাঞ্জলতার মাধ্যমে পাঠকের কাছে রচনা সহজবোধ্য হয়ে ওঠার কারণে লেখক প্রাঞ্জলতাকে রচনার সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার আখ্যা দিয়েছেন।
সরলতা বা প্রাঞ্জলতা রচনার একটি বিশেষ গুণ। রচনার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য যেই অলংকারই ব্যবহার করা হোক না কেন পাঠক যদি লেখার মর্ম না বোঝে, অর্থাৎ লেখা যদি পাঠকের বোধগম্য না হয় তাহলে সে রচনা বৃথা। যে লেখা সহজে পাঠক বুঝতে পারে সেটিই সেরা লেখা। তাই এ ধরনের লেখা সহজে পাঠকনন্দিত হয়। এ কারণেই লেখক প্রাঞ্জলতাকে রচনার সর্বশ্রেষ্ঠ অলংকার আখ্যা দিয়েছেন।
উত্তর: উৎকৃষ্ট লেখক ও উত্তম রচনা তৈরিতে সহায়তা করার মাধ্যমে প্রবন্ধে উল্লিখিত পরামর্শগুলো লেখক ও পাঠকদের উপকৃত করবে।
আলোচ্য প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আদর্শ লেখক হওয়ার উপায় সম্পর্কে উপদেশ প্রদান করেছেন। সেই সঙ্গে কীভাবে উৎকৃষ্ট রচনা লেখা যায় তার পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। নবীন লেখকগণ তাঁর পরামর্শসমূহ মেনে চললে উৎকৃষ্ট লেখক হওয়ার অনুপ্রেরণা পাবে। সেই সঙ্গে উন্নতমানের পাঠকবান্ধব রচনা তৈরিতেও সক্ষম হবে, যা পাঠকদের পড়ার আগ্রহ বৃদ্ধি করবে। এভাবেই বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশসমূহ থেকে লেখক ও পাঠকরা উপকৃত হবে।
